সাজ্জাদ সাহেবের সেই বিশাল শোবার ঘরের নরম তোশকের ওপর রাতভর চলা সেই হিংস্র, পৈশাচিক ও ক্লান্তিকর মিলনের রেশ কাটতে না কাটতে ভোরের আলো যখন মফস্বলের ধুলোমাখা ভেন্টিলেটর গলিয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়ল, তখন চারপাশের পরিবেশটা ছিল থমথমে। অর্ক রাত শেষের দিকে নিজের শার্টটা গায়ে গলিয়ে রাতের অন্ধকারেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু রেহানার ঘরের ভেতরে তখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল তাদের সেই মহাপাপের সুবাস—ঘাম, পারফিউম আর রেহানার শরীর থেকে ঝরে পড়া কামরসের উগ্র গন্ধ।
সকালের সূর্য ওঠার সাথে সাথেই ঘরের ভেতর এক অদৃশ্য অস্বস্তি ও সাবধানতার তাগিদ শুরু হলো। কারণ, এই উন্মত্ততার মাঝেও বাড়িতে একজন মানুষ রয়ে গেছে—বৃদ্ধা খালা । পেছনের কোয়ার্টারে থাকা এই মহিলাটির ঝাপসা দৃষ্টি, কানে কম শোনার ভান কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে বারান্দায় বা রান্নাঘরের পাশে হেঁটে বেড়ানোর পুরোনো অভ্যাস যেকোনো মুহূর্তে তাদের এই গোপন নেশাকে প্রকাশ্যে এনে দিতে পারত। রেহানা খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিল, অর্কর সাথে তার এই আদিম ও লাগামহীন উল্লাসের মাঝে সামান্যতম কোনো ঝুঁকি বা ফাঁকফোকর রাখা চলবে না। গত রাতে শোবার খাটে যেভাবে তারা পশুর মতো একে অপরকে চিরে ফেলেছে, তার সামান্য প্রমাণও যদি এই বুড়ির চোখে পড়ে যায়, তবে সাজ্জাদ সাহেব বাড়ি ফেরার আগেই সব শেষ হয়ে যাবে।
তাই তো, সকাল হতেই রেহানা নিজের মনের মধ্যে এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও চতুর ফন্দি এঁটে ফেলল। সে নিজের চেহারার মধ্যে এক চরম দুশ্চিন্তা ও মায়াকান্নার নিখুঁত অভিনয় ফুটিয়ে তুলল। সকালে যখন খালা বুয়া রান্নাঘরের বারান্দায় চা বসাতে এসেছিল, রেহানা তখন এলো চুলে, ক্লান্ত মুখে তার সামনে গিয়ে হাজির হলো। সে চোখের কোণে একটু কৃত্রিম জল এনে অত্যন্ত আদুরে ও উদ্বেগের সুরে বলল, "খালা , আপনাকে একটা কথা বলতে খুব মন খারাপ লাগছে। কাল রাত থেকেই আমার বুকটা কেমন যেন করছে। আপনার তো অনেক দিন হলো দেশের বাড়ি যাওয়া হয় না। এদিকে খবর পেলাম আপনার ছোট মেয়ের শরীর নাকি ইদানিং খুব খারাপ যাচ্ছে, পেটের পীড়ায় ভুগছে শুনলাম।"
বৃদ্ধা খালা রেহানার এমন হঠাৎ দরদে কিছুটা অবাক হলো, কারণ এই মেয়েটিকে সে আজীবন একটু গম্ভীর ও পর্দানশীন হিসেবেই দেখে এসেছে। বুড়ি সন্দিগ্ধ গলায় বলল, "কী যে কও মা! আমার আবার বাড়ি যাওয়া... হুজুর তো মানা করেন চট করে কোথাও যেতে।"
রেহানা সঙ্গে সঙ্গে খালার হাত দুটো নিজের ফর্সা হাতে জড়িয়ে ধরে আরও দরদি গলায় বলে উঠল, "আরে হুজুর তো এখন বাইরে আছেন, ওনি ফিরতে তো আরও বেশ কিছুদিন দেরি হবে। আপনি আর এক মুহূর্তও দেরি করবেন না। আপনি বরং আগামী কয়েকটা দিন আপনার গ্রাম থেকে ঘুরে আসুন, মেয়েটাকে দেখে আসুন। আর হ্যাঁ, আপনার যাতায়াতের ভাড়ার টাকা আর কিছু বাড়তি হাতখরচ আমি এখনই আমার ক্যাশ বাক্স থেকে বের করে দিচ্ছি। আপনি আজকেই দুপুরের বাসের আগে রওনা হয়ে যান। হুজুর বাড়ি ফিরলে আমি নিজেই ওনাকে বুঝিয়ে বলব, আপনার কোনো চিন্তা করতে হবে না।"
বৃদ্ধা খালা রেহানার এই হঠাৎ অতিরিক্ত দয়া এবং টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেখে আর কোনো দ্বিমত করল না। গ্রামের বাড়ির টান, অসুস্থ মেয়ের চিন্তা এবং নগদ কিছু টাকা হাতে পাওয়ার লোভ—সব মিলিয়ে সে রাজি হয়ে গেল। দুপুরের দিকে একটা পুরনো ভ্যানগাড়ি ডেকে খালা তার ছোট একটা কাপড়ের পোটলা নিয়ে যখন গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল, তখন রেহানা মূল দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যটি গভীর চোখে দেখছিল। ভ্যানটা যখন গলির মোড় ঘুরে মেইন রোডের দিকে চলে গেল এবং চোখের আড়াল হয়ে গেল, তখন রেহানার বুক থেকে যেন হাজার মনের শেষ অদৃশ্য পাথরটাও চিরতরে সরে গেল।
পুরো বাড়িটি এখন এক্কেবারে ফাঁকা, নিঃসঙ্গ এবং চার দেওয়ালের ভেতর সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের দখলে। কোথাও কোনো বাধা নেই, কোনো নজরদারি নেই, কোনো ছায়ার ভয় নেই। গত রাতের সেই শোবার ঘরের খাট থেকে শুরু করে ড্রইংরুম—সব জায়গা আজ শুধু তাদের জন্য উন্মুক্ত।
খালা চলে যাওয়ার ঠিক দুঘণ্টা পর, যখন বিকেলের ম্লান সোনাঝরা আলো চারপাশের গাছপালা ছাপিয়ে ঘরের ভেন্টিলেটরে এসে পড়ল, তখন সদর দরজার কড়া নাড়ার সেই নির্দিষ্ট, চেনা ডাবল টোকাটা বেজে উঠল।
রিং হতেই রেহানার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে আজ আর গায়ে কোনো বোরকা বা নিকাবের তোয়াক্কা করল না, এমনকি শালীনতার বালাইটুকুও রাখল না। সে নিজের গায়ে একটি পাতলা, ফিনফিনে সুতির স্লিভলেস গাউন জড়িয়ে সরাসরি দরজার কাছে ছুটে গেল। লকটা ঘুরিয়ে সে যখন ভারী পাল্লাটা টান দিয়ে খুলল, তখন ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্কর সেই চশমা পরা ফর্সা মুখমণ্ডল, পরিপাটি চুল আর চোখে এক চিলতে বুনো শিকারীর চকচকে চাহনি তার সমস্ত সত্তাকে নাড়িয়ে দিল।
অর্ক ঘরের ভেতর এক পা দিয়ে চোখ বুলিয়ে যখন বুঝতে পারল যে বাড়ি এখন একশো ভাগ ফাঁকা, তখন তার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক, কুটিল ও বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। সে ভেতরে পা রেখেই সদর দরজাটা ভেতর থেকে সজোরে লক করে দিল এবং ভারী পিতলের ছিটকিনিটা নামিয়ে দিয়ে আটকিয়ে দিল।
অর্ক সোফায় নিজের ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে রেহানাকে এক টানে নিজের বুকের সাথে সেঁটে ধরল। সে রেহানার ঘাড়ের নরম চামড়ায় নিজের মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, "কী রেহানা বেগম? আজ বাড়ির দরজা বন্ধ করার সময় কোনো মুরুব্বির চোখের ভয় করতে হচ্ছে না যে?"
রেহানা অর্কের শার্টের কলারটা দুই হাতে খামচে ধরে উন্মত্তের মতো বলে উঠল, "একদম না অর্ক বাবু! পুরো বাড়ি এখন শুধুই আমাদের নরক! খালাকে আমি নিজেই তাড়িয়ে দিয়েছি। গত রাতের সেই শোবার ঘরের খাট থেকে শুরু করে এই পুরো বাড়ি আজ শুধুই আমাদের। আজ থেকে যা ইচ্ছে করুন, যেভাবে ইচ্ছে চিরে ফেলুন আমায়! আমি আর কোনো সমাজ বা নিয়ম মানি না!"
সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হলো তাদের রূপকথার মতো এক অন্ধকারের রাজত্ব। দিন আর রাতের কোনো হিসাব রইল না। ড্রইংরুমের সোফা থেকে শুরু করে সাজ্জাদ সাহেবের সেই বিশাল শোবার ঘরের নরম তোশক—সব জায়গা হয়ে উঠল তাদের আদিম উল্লাসের একেকটি রণক্ষেত্র। বাড়ির পাশের মেইন রোড দিয়ে শত শত মানুষ যাতায়াত করছে, গাড়ি-ঘোড়ার হর্ন বাজছে, কিন্তু এই বাড়ির ভেতর তখন কেবলই অর্কর উগ্র ওয়েস্টার্ন পারফিউমের গন্ধ, রেহানার কামার্ত দীর্ঘশ্বাসী শীৎকার আর লাগাতার পচাৎ-পচাৎ শব্দের পৈশাচিক ঝড় বইছে।
সমাজের সমস্ত নিয়ম, পবিত্রতার ভুয়া খোলস আর ধর্মের সব অনুশাসনকে তারা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এমন এক দুনিয়ায় প্রবেশ করল, যেখানকার একমাত্র আইন ছিল—শুধু শরীর, আর শরীর! রেহানা এখন পুরোপুরি অর্কের পৈশাচিক কামনার নেশায় এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে আর কোনোদিন আলোয় ফিরে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা বা পথ বাকি নেই।
[পরের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন]
চলবে তো নাকি....? কমেন্টে মতামত জানান।
লেখা: দিপ সিংহ রায়।

0 মন্তব্যসমূহ